ডাইরির ছেঁড়া পাতা - ২০
আজ সকালে ঝিরঝিরে বৃষ্টির মাঝে বাসস্টপে যাচ্ছি যখন, আনমনে গুনগুন করে একটা গান গাইছিলাম. হঠাৎ থমকে দাঁড়ালাম - মনে হল আজ এমূহুর্তে এ গান কেন মনে এল? গানটি একটি বহু পুরোনো বাঙলা গান "এবার আমি আমার থেকে আমাকে বাদ দিয়ে অনেক কিছু জীবনে যোগ দিলাম....ছোট যত আপন ছিল বাহির করে দিয়ে ভুবনটারে আপন করে নিলাম"। ১৯৬১ সালে শ্রদ্ধেয় সলিল চৌধুরীর কথায় ও সুরে এ গান গেয়েছিলেন শচীন গুপ্ত। ১৯৮০তে যখন পুনরায় এ গান লতা মঙ্গেশকর রেকর্ড করেন, তখন আমি নিতান্তই ছোট এবং সেই প্রথম আমার রেডিওতে এ গান শোনা। সেইসময় একজনের গলাতেই সামনে থেকে আমি এ গান শুনি - এ কথা ভাবতে গিয়েই মনে পড়ল আজো অবধি এ গান রেকর্ডের বাইরে ওই একজনের গলাতেই শোনা আমার!
বুলুর ভালো নাম ইলোরা, তবে আমার ধারণা ছিল তার দিকে তাকিয়ে এ পৃথিবীর কেউই ইলোরা গুহার প্রাচীন স্থাপত্য-ভাস্কর্যের সৌন্দর্যের কথা মনে করবেন না! মানুষের মন যদি চোখে-মুখে ফুটে ওঠে ভাবা যায় - তবে বুলুর ক্ষেত্রে সেই কথা একশোভাগ বলা চলে। অন্যভাবে ভাবা যেতে পারে যে তার মত হিংসুটে এবং ঝগড়াটে মানুষ এ পৃথিবীতে দুর্লভ। তাই আমার কাছাকাছি বয়েস এবং আমাদের কোয়ার্টাসে তার বাস হলেও আমি তাকে এড়িয়ে চলতাম। যেটুকু মেলামেশা হত তা একটিমাত্র বিষয়কে কেন্দ্র করে - সেটা ছিল গান। বুলু কোথাও কখনো গান না শিখেও রেডিওতে শুনে শুনে গান তুলে ফেলত এবং নিখুঁত পারদর্শীতায় সেগুলো গাইতে পারত।
বুলুর দিদি অর্থাৎ টুলুদির ভালো নাম অজন্তা - বেশ ভালো নাচত সে। তখন এখনকার মত নাচের সাথে রেকর্ড করা গান বাজানোর রেওয়াজ ছিল না, উপরন্তু সেসব গান তেমন মিলতো ও না। তাই টুলুদির নাচের সাথে বহুসময় আমি গান গাইতাম। টুলুদির ব্যবহার ভারি চমৎকার ছিল, তাই মহড়া দেবার সময়গুলোতে ভালো ও লাগত। বুলুর মেজাজ ভালো থাকায় সে কয়েকবার টুলুদির নাচের সাথে গান গেয়েছিল, তবে দু-একবার নাচের অনুষ্ঠানের দিন দুয়েক আগে মেজাজ বিগড়ে যাওয়াতে সে গান গাইবেনা বলে দেওয়ায় আমাকে তাড়াহুড়ো করে গান তুলে টুলুদির নাচের অনুষ্ঠান সুসম্পন্ন করে দিতে হয়েছিল।
বুলুর সাথে আমার এবং আমার বয়েসীদের যে অমিলটা ছিল সেটা হল তার পরিণত গলার আওয়াজ এবং যে গানগুলো সে গাইতে পছন্দ করত। আমরা সব গাইতাম "বুলবুল পাখি ময়না টিয়ে.... আয় না যা না গান শুনিয়ে" অথবা নাচের সাথে "শুকনো পাতার নূপুর পায়ে নাচিছে ঘূর্ণীর বায়" কিম্বা "খরবায়ু বয় বেগে চারিদিক ছায় মেঘে ওগো নেয়ে নাওখানি বাইয়ো"। এছাড়া ছিল প্রার্থনা-সঙ্গীত যেটা বেশীরভাগ সময়েই ছিল রবীন্দ্রসঙ্গীত বা ব্রহ্মসঙ্গীত যেমন "বরিষধারা মাঝে শান্তির বারি" অথবা "নব আনন্দে জাগো আজি নব রবিকিরণে"। এসব গানের কথা সম্যকভাবে সেই বয়েসে উপলব্ধি করতে পারতাম না, তবে শান্ত পরিবেশে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে গাইছি ভেবে একটা ভাব-গম্ভীর আবেশ আসত মনে।
এসব গান বুলুও গাইত তবে ও যখন গাইত "এ মন মোর জানিনা কোথা যে হারালো ঠিকানা না দিয়ে শরমে কাঁদিয়ে" অথবা "গানেরই খাতায় স্বরলিপি লিখে বলো কি হবে....জীবনখাতার ছিন্নপাতা শুধু বেহিসাবে ভরে রবে" তখন সেসব গানের কথা আমার কাছে ভারি দুর্বোধ্য মনে হত। তবে বুলুর যত্ন করে সুর লাগানো, শব্দের উচ্চারণ সবকিছু মিলেমিশে পরিবেশে একটা মন-ছুঁয়ে যাওয়া সুরের আবেশ তৈরি করত। এসব গানের ভাষা বুলু বুঝে গাইত না কি না বুঝে - এ নিয়ে একটা কৌতূহল মনে থাকলেও কোনোদিন তাকে জিজ্ঞাসা করতে পারিনি - হয়ত আবার এটা নিয়েই কোনো ঝগড়া বাধিয়ে দেবে!
মজুমদারকাকু থাকতেন আমাদের সামনের কোয়ার্টারে। কাকুর "কৃষ্ণগোপাল" নামটা নিয়ে আমরা আড়ালে হাসাহাসি করলেও কাকুকে আমরা সবাই খুব পছন্দ করতাম। বাচ্চাদের সাথে হৈ চৈ এ মাততে কাকুর জুড়ি ছিল না। কাকিমার কাছে ছিল আমাদের যত বায়না আর আবদার অবশ্যই তাঁর সস্নেহ প্রশ্রয় পেয়ে। কাকু এবং কাকিমা দুজনেই ভালো গান গাইতেন, তাই কাকুর কোয়ার্টারে মাঝে মাঝেই গান-বাজনার আসর বসত। সে আসরে শ্রোতা বা শিল্পী হিসেবে বড়দের তুলনায় ছোটদেরই সংখ্যা হয়ে যেত বেশি। রবীন্দ্র বা নজরুল জয়ন্তীর মত উৎসবে মেতে জলসা ছাড়াও সামান্য কারণে বসে যেত আসর। যেমন বর্ষাকালে অঝোরে বৃষ্টি চলতে থাকত মাঝে মাঝেই, এমন বর্ষার কোনো বিকেল-সন্ধেয় কাকু-কাকিমার কোয়ার্টারের ভেতরদিকের টানা বারান্দায় বসে যেত নাচ-গান-বাজনা-আবৃত্তির আসর। কাকিমা অবশ্য রান্নাঘরেই ব্যস্ত থাকতেন আর আমাদের অফুরন্ত যোগান দিয়ে যেতেন আলুর চপ, পেঁয়াজী, বেগুনি। আমি ভালোবাসতাম চিংড়িমাছের চপ খেতে, সেকথা মনে রেখে কাকিমা সেটাও করে খাওয়াতেন।
আমাদের এই গান-বাজনার আসরে বুলু তেমনটা আসত না। এর একটাই কারণ কাকু-কাকিমা তাকে সমাদর করে বসালেও একটু বাদেই আমাদের কারো না কারো সাথে তার ঝগড়া বেধে যেত কখনো কখনো তুচ্ছ কারণেই।
ঝাপসা মনে পড়ে এক বর্ষার বিকেলের কথা।টানা বৃষ্টি চলেছে কয়েকদিন ধরে। স্কুলে "রেনি-ডে"র দৌলতে একটা পুরোদিন ছুটি পেয়ে আমরা খুব খুশী। আমাদের দুটো কোয়ার্টার বিল্ডিং এর মাঝের সরু রাস্তাটা হয়ে দাঁড়িয়েছে একটা ঘোলা জলের পুকুর। বাবা গামবুট পরে বাজারে গিয়ে ইলিশমাছ এনেছেন, তা দিয়ে আমি বাদে আর সবার উৎসব। আমার জন্য অবশ্য এনেছেন কদমফুল। সেই ফুল বারেবারে নাকের কাছে এনে তার তীব্র গন্ধে আমি চেষ্টা করছি মাছের গন্ধকে ভুলে থাকতে। দুপুরের খাওয়া-দাওয়া হয়ে গিয়েছে এমন সময় মজুমদারকাকুর আগমন। বিকেল থেকে তার বাড়িতে জমায়েত হতে বলার আমন্ত্রণ।
এ প্রসঙ্গে জানাই যে কাকুর বাড়িতে গানের জলসা বছরের যে সময়ে যে কারণেই বসুক না কেন, কাকিমা যদি গান গাইতে বসতেন তাহলে অবধারিতভাবে তিনি একটি গান গাইতেন-ই। সেটা রবি ঠাকুরের একটি গান - "দিয়ে গেনু বসন্তের এই গানখানি"। তাই হয়ত কাকিমার কথা ভাবতে বসলেই যে ছবিটা মনে আসে সেটা হল কাকিমা হারমোনিয়াম বাজিয়ে এই গানটা গাইছেন, পরনে হাল্কা গোলাপী রঙের জর্জেট শাড়িতে সাদা সুতোর কাজ, গলায় কানে রঙ মিলিয়ে ইমিটেশন গয়না - এখন যাকে বলা হয় কস্টিউম জুয়েলারী।
সেদিন যথারীতি কাকুর বাড়িতে জলসা শুরু। উঠোনে বৃষ্টি পড়া দেখতে দেখতে আমরা গান-বাজনা হৈ চৈ খাওয়া-দাওয়া সব করছি। সবাই গাইছে বৃষ্টির গান, পড়া হচ্ছে বৃষ্টি নিয়ে লেখা, কেউ বা আবৃত্তি করছে "তারি সঙ্গে মনে পড়ে ছেলেবেলার গান, বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর নদে এল বান"। এমন সময় বুলু জানাল যে সে এবারে গান গাইবে। আমরা একে অন্যকে গান গাওয়ার ফরমায়েশ করতাম, কেউ গাইতে না চাইলে তাকে জোর-জবরদস্তি করেও গাওয়াতাম। বুলুর প্রতি অমনটা করার সাহস আমাদের বেশিরভাগেরই ছিল না। বুলু সেবারে প্রথমে গোটা দুয়েক গান গাইল যা শোনা, তারপরেই ও গাইতে শুরু করল "এবার আমি আমার থেকে....."। আর কেউ সে গান আগে কখনো শুনেছিল কিনা জানিনা, আমি অন্তত প্রথমবার শুনলাম। আজো স্পষ্ট মনে পড়ে বাইরে বৃষ্টির শব্দের সাথে সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে বুলুর সুর আর তাতে জড়ানো কথা "সবার হরষে হাসি বেদনে কাঁদি, বাঁধন-প্রিয়ারে মুক্তির জালে বাঁধি.....সবই হারায়ে আবার সবই কিছু যে পেলাম"। বুলু কি আজো পারে অমনভাবে গান গাইতে? কি জানি!
আজ সকালে ঝিরঝিরে বৃষ্টির মাঝে বাসস্টপে যাচ্ছি যখন, আনমনে গুনগুন করে একটা গান গাইছিলাম. হঠাৎ থমকে দাঁড়ালাম - মনে হল আজ এমূহুর্তে এ গান কেন মনে এল? গানটি একটি বহু পুরোনো বাঙলা গান "এবার আমি আমার থেকে আমাকে বাদ দিয়ে অনেক কিছু জীবনে যোগ দিলাম....ছোট যত আপন ছিল বাহির করে দিয়ে ভুবনটারে আপন করে নিলাম"। ১৯৬১ সালে শ্রদ্ধেয় সলিল চৌধুরীর কথায় ও সুরে এ গান গেয়েছিলেন শচীন গুপ্ত। ১৯৮০তে যখন পুনরায় এ গান লতা মঙ্গেশকর রেকর্ড করেন, তখন আমি নিতান্তই ছোট এবং সেই প্রথম আমার রেডিওতে এ গান শোনা। সেইসময় একজনের গলাতেই সামনে থেকে আমি এ গান শুনি - এ কথা ভাবতে গিয়েই মনে পড়ল আজো অবধি এ গান রেকর্ডের বাইরে ওই একজনের গলাতেই শোনা আমার!
বুলুর ভালো নাম ইলোরা, তবে আমার ধারণা ছিল তার দিকে তাকিয়ে এ পৃথিবীর কেউই ইলোরা গুহার প্রাচীন স্থাপত্য-ভাস্কর্যের সৌন্দর্যের কথা মনে করবেন না! মানুষের মন যদি চোখে-মুখে ফুটে ওঠে ভাবা যায় - তবে বুলুর ক্ষেত্রে সেই কথা একশোভাগ বলা চলে। অন্যভাবে ভাবা যেতে পারে যে তার মত হিংসুটে এবং ঝগড়াটে মানুষ এ পৃথিবীতে দুর্লভ। তাই আমার কাছাকাছি বয়েস এবং আমাদের কোয়ার্টাসে তার বাস হলেও আমি তাকে এড়িয়ে চলতাম। যেটুকু মেলামেশা হত তা একটিমাত্র বিষয়কে কেন্দ্র করে - সেটা ছিল গান। বুলু কোথাও কখনো গান না শিখেও রেডিওতে শুনে শুনে গান তুলে ফেলত এবং নিখুঁত পারদর্শীতায় সেগুলো গাইতে পারত।
বুলুর দিদি অর্থাৎ টুলুদির ভালো নাম অজন্তা - বেশ ভালো নাচত সে। তখন এখনকার মত নাচের সাথে রেকর্ড করা গান বাজানোর রেওয়াজ ছিল না, উপরন্তু সেসব গান তেমন মিলতো ও না। তাই টুলুদির নাচের সাথে বহুসময় আমি গান গাইতাম। টুলুদির ব্যবহার ভারি চমৎকার ছিল, তাই মহড়া দেবার সময়গুলোতে ভালো ও লাগত। বুলুর মেজাজ ভালো থাকায় সে কয়েকবার টুলুদির নাচের সাথে গান গেয়েছিল, তবে দু-একবার নাচের অনুষ্ঠানের দিন দুয়েক আগে মেজাজ বিগড়ে যাওয়াতে সে গান গাইবেনা বলে দেওয়ায় আমাকে তাড়াহুড়ো করে গান তুলে টুলুদির নাচের অনুষ্ঠান সুসম্পন্ন করে দিতে হয়েছিল।
বুলুর সাথে আমার এবং আমার বয়েসীদের যে অমিলটা ছিল সেটা হল তার পরিণত গলার আওয়াজ এবং যে গানগুলো সে গাইতে পছন্দ করত। আমরা সব গাইতাম "বুলবুল পাখি ময়না টিয়ে.... আয় না যা না গান শুনিয়ে" অথবা নাচের সাথে "শুকনো পাতার নূপুর পায়ে নাচিছে ঘূর্ণীর বায়" কিম্বা "খরবায়ু বয় বেগে চারিদিক ছায় মেঘে ওগো নেয়ে নাওখানি বাইয়ো"। এছাড়া ছিল প্রার্থনা-সঙ্গীত যেটা বেশীরভাগ সময়েই ছিল রবীন্দ্রসঙ্গীত বা ব্রহ্মসঙ্গীত যেমন "বরিষধারা মাঝে শান্তির বারি" অথবা "নব আনন্দে জাগো আজি নব রবিকিরণে"। এসব গানের কথা সম্যকভাবে সেই বয়েসে উপলব্ধি করতে পারতাম না, তবে শান্ত পরিবেশে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে গাইছি ভেবে একটা ভাব-গম্ভীর আবেশ আসত মনে।
এসব গান বুলুও গাইত তবে ও যখন গাইত "এ মন মোর জানিনা কোথা যে হারালো ঠিকানা না দিয়ে শরমে কাঁদিয়ে" অথবা "গানেরই খাতায় স্বরলিপি লিখে বলো কি হবে....জীবনখাতার ছিন্নপাতা শুধু বেহিসাবে ভরে রবে" তখন সেসব গানের কথা আমার কাছে ভারি দুর্বোধ্য মনে হত। তবে বুলুর যত্ন করে সুর লাগানো, শব্দের উচ্চারণ সবকিছু মিলেমিশে পরিবেশে একটা মন-ছুঁয়ে যাওয়া সুরের আবেশ তৈরি করত। এসব গানের ভাষা বুলু বুঝে গাইত না কি না বুঝে - এ নিয়ে একটা কৌতূহল মনে থাকলেও কোনোদিন তাকে জিজ্ঞাসা করতে পারিনি - হয়ত আবার এটা নিয়েই কোনো ঝগড়া বাধিয়ে দেবে!
মজুমদারকাকু থাকতেন আমাদের সামনের কোয়ার্টারে। কাকুর "কৃষ্ণগোপাল" নামটা নিয়ে আমরা আড়ালে হাসাহাসি করলেও কাকুকে আমরা সবাই খুব পছন্দ করতাম। বাচ্চাদের সাথে হৈ চৈ এ মাততে কাকুর জুড়ি ছিল না। কাকিমার কাছে ছিল আমাদের যত বায়না আর আবদার অবশ্যই তাঁর সস্নেহ প্রশ্রয় পেয়ে। কাকু এবং কাকিমা দুজনেই ভালো গান গাইতেন, তাই কাকুর কোয়ার্টারে মাঝে মাঝেই গান-বাজনার আসর বসত। সে আসরে শ্রোতা বা শিল্পী হিসেবে বড়দের তুলনায় ছোটদেরই সংখ্যা হয়ে যেত বেশি। রবীন্দ্র বা নজরুল জয়ন্তীর মত উৎসবে মেতে জলসা ছাড়াও সামান্য কারণে বসে যেত আসর। যেমন বর্ষাকালে অঝোরে বৃষ্টি চলতে থাকত মাঝে মাঝেই, এমন বর্ষার কোনো বিকেল-সন্ধেয় কাকু-কাকিমার কোয়ার্টারের ভেতরদিকের টানা বারান্দায় বসে যেত নাচ-গান-বাজনা-আবৃত্তির আসর। কাকিমা অবশ্য রান্নাঘরেই ব্যস্ত থাকতেন আর আমাদের অফুরন্ত যোগান দিয়ে যেতেন আলুর চপ, পেঁয়াজী, বেগুনি। আমি ভালোবাসতাম চিংড়িমাছের চপ খেতে, সেকথা মনে রেখে কাকিমা সেটাও করে খাওয়াতেন।
আমাদের এই গান-বাজনার আসরে বুলু তেমনটা আসত না। এর একটাই কারণ কাকু-কাকিমা তাকে সমাদর করে বসালেও একটু বাদেই আমাদের কারো না কারো সাথে তার ঝগড়া বেধে যেত কখনো কখনো তুচ্ছ কারণেই।
ঝাপসা মনে পড়ে এক বর্ষার বিকেলের কথা।টানা বৃষ্টি চলেছে কয়েকদিন ধরে। স্কুলে "রেনি-ডে"র দৌলতে একটা পুরোদিন ছুটি পেয়ে আমরা খুব খুশী। আমাদের দুটো কোয়ার্টার বিল্ডিং এর মাঝের সরু রাস্তাটা হয়ে দাঁড়িয়েছে একটা ঘোলা জলের পুকুর। বাবা গামবুট পরে বাজারে গিয়ে ইলিশমাছ এনেছেন, তা দিয়ে আমি বাদে আর সবার উৎসব। আমার জন্য অবশ্য এনেছেন কদমফুল। সেই ফুল বারেবারে নাকের কাছে এনে তার তীব্র গন্ধে আমি চেষ্টা করছি মাছের গন্ধকে ভুলে থাকতে। দুপুরের খাওয়া-দাওয়া হয়ে গিয়েছে এমন সময় মজুমদারকাকুর আগমন। বিকেল থেকে তার বাড়িতে জমায়েত হতে বলার আমন্ত্রণ।
এ প্রসঙ্গে জানাই যে কাকুর বাড়িতে গানের জলসা বছরের যে সময়ে যে কারণেই বসুক না কেন, কাকিমা যদি গান গাইতে বসতেন তাহলে অবধারিতভাবে তিনি একটি গান গাইতেন-ই। সেটা রবি ঠাকুরের একটি গান - "দিয়ে গেনু বসন্তের এই গানখানি"। তাই হয়ত কাকিমার কথা ভাবতে বসলেই যে ছবিটা মনে আসে সেটা হল কাকিমা হারমোনিয়াম বাজিয়ে এই গানটা গাইছেন, পরনে হাল্কা গোলাপী রঙের জর্জেট শাড়িতে সাদা সুতোর কাজ, গলায় কানে রঙ মিলিয়ে ইমিটেশন গয়না - এখন যাকে বলা হয় কস্টিউম জুয়েলারী।
সেদিন যথারীতি কাকুর বাড়িতে জলসা শুরু। উঠোনে বৃষ্টি পড়া দেখতে দেখতে আমরা গান-বাজনা হৈ চৈ খাওয়া-দাওয়া সব করছি। সবাই গাইছে বৃষ্টির গান, পড়া হচ্ছে বৃষ্টি নিয়ে লেখা, কেউ বা আবৃত্তি করছে "তারি সঙ্গে মনে পড়ে ছেলেবেলার গান, বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর নদে এল বান"। এমন সময় বুলু জানাল যে সে এবারে গান গাইবে। আমরা একে অন্যকে গান গাওয়ার ফরমায়েশ করতাম, কেউ গাইতে না চাইলে তাকে জোর-জবরদস্তি করেও গাওয়াতাম। বুলুর প্রতি অমনটা করার সাহস আমাদের বেশিরভাগেরই ছিল না। বুলু সেবারে প্রথমে গোটা দুয়েক গান গাইল যা শোনা, তারপরেই ও গাইতে শুরু করল "এবার আমি আমার থেকে....."। আর কেউ সে গান আগে কখনো শুনেছিল কিনা জানিনা, আমি অন্তত প্রথমবার শুনলাম। আজো স্পষ্ট মনে পড়ে বাইরে বৃষ্টির শব্দের সাথে সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে বুলুর সুর আর তাতে জড়ানো কথা "সবার হরষে হাসি বেদনে কাঁদি, বাঁধন-প্রিয়ারে মুক্তির জালে বাঁধি.....সবই হারায়ে আবার সবই কিছু যে পেলাম"। বুলু কি আজো পারে অমনভাবে গান গাইতে? কি জানি!
No comments:
Post a Comment