Friday, February 10, 2012














ড্যানি - পৃথিবীর বিজয়ী/রোয়াল্ড ডল
অনুবাদিকার নিবেদন:  যদিও গল্পটির পাঠক-পাঠিকার বয়:সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে আট থেকে বারো বছর, তবে আমার ধারণা বয়েস বাড়লেও বহু মানুষের মনের অভ:ন্তরে লুকিয়ে থাকে সেই সবুজ ছোটবেলা - যার রঙবদল ও নেই, বিবর্ণ হওয়াও নেই। তাই এই গল্পের পাঠক-পাঠিকা সেইসব বড় বা বুড়ো মানুষরাও হয়ে যেতে পারেন নির্দ্বিধায়।


পেট্রল পাম্প (১)
আমার যখন চারমাস বয়েস, আমার মা হঠাৎ মারা যায় এবং আমার বাবা আমার দেখাশুনো করার কাজে  একদম একা হয়ে যায়। আমার কোনো ভাই-বোন ও ছিল না, কাজেই চারমাস বয়েসের পর থেকে আমার সমস্ত ছেলেবেলা জুড়ে ছিলাম শুধু আমি আর আমার বাবা। পেট্রল পাম্পের পেছনদিকে একটা পুরোনো জিপসী ক্যারাভানে আমরা থাকতাম। এই পেট্রল পাম্প, ক্যারাভান আর তার পেছনদিকের ছোট্ট ঘাসজমির মালিক ছিল আমার বাবা, সারা পৃথিবীতে স্রেফ এইটুকুই ছিল আমার বাবার নিজের বলতে সম্পত্তি। মাঠ আর বনে-ঘেরা পাহাড়ের মাঝে একটা সরু গ্রামের রাস্তায় ছিল এই পাম্পটা।

আমি যখন একটা ছোট্ট বাচ্চা, আমার বাবা আমাকে পরিস্কার করাত, খাওয়াত, জামা বদলে দিত - আরো কত কি হাজার একটা কাজ করত যেগুলো সচরাচর মায়েরাই করে থাকে তাদের বাচ্চাদের জন্য। একজন পুরুষমানুষের পক্ষে কাজগুলো মোটেও সহজসাধ্য ছিল না বিশেষত: তাকে যখন আবার মোটরগাড়ি মেরামত করে, পেট্রলপাম্পে আসা লোকজনকে পেট্রল বিক্রি করে সংসার ও চালাতে হচ্ছে। তবে আমার বাবা কিন্তু এতে কিছুই মনে করত না। আমার মনে হয় - মায়ের প্রতি তার সব ভালোবাসা সে উজাড় করে আমায় দিয়ে দিয়েছিল। ছোটবেলায় তাই একবারের জন্য ও আমার শরীর ও মন কিচ্ছু কখনোই খারাপ হয়নি!

তাই আমার পাঁচ বছরের জন্মদিনে আমি ছিলাম একটা ছোট্ট ছেলে যার সারা শরীর জুড়ে গাড়ির তেলকালি-মাখা। এর কারণ হল সারাদিন ধরে আমি আমার বাবাকে সাহায্য করি গাড়ি মেরামত করতে।

পেট্রল পাম্পে মাত্র দুটো পাম্প, আর সেই পাম্পগুলোর পেছনে একটা কাঠের ছাউনি-দেওয়া ঘর যেটা বাবার অফিস। অফিসে একটা পুরোনো টেবিল আর একটা ক্যাশবাক্স ছাড়া আর কিছুই ছিলনা। এই ক্যাশবাক্সটায় একটা বোতাম টিপলে ঘন্টা বাজে, আর ড্রয়ারটা দুম করে ছিটকে বাইরে বেরিয়ে আসে। আমার এটা দারুণ লাগত। অফিসের ডানদিকে চৌকো ইঁটের বাড়িটা ছিল বাবার কারখানা। বাবা খুব যত্ন করে এটা তৈরি করেছিল, ওখানে ওটাই ছিল একমাত্র মজবুত জিনিষ।

"তুই আর আমি - আমরা দুজনেই হলাম ইনজিনিয়ার", বাবা প্রায়ই বলত আমায়, "ইনজিন মেরামত করে আমরা টাকা রোজগার করি কাজেই কারখানাটা ভাঙ্গাচোরা  হলে তো আর আমরা ভালোভাবে কাজ করতে পারবনা।" কারখানাটা কিন্তু বেশ ছিল, একটা গাড়ি রাখার মত বড় জায়গা ছাড়াও পাশে বসে-শুয়ে-দাঁড়িয়ে মেরামত করার মত অনেকটা জায়গা ছিল। ভেতরে একটা টেলিফোন ও ছিল যেটাতে লোকজন ফোন করে তাদের গাড়ি নিয়ে আসত।

আমাদের ঘর-বাড়ি বলতে সবকিছুই ছিল ওই ক্যারাভানটা। এটা সত্যিই একটা বড় বড় চাকাওয়ালা পুরোনো জিপসীদের গাড়ি যার গায়ে খুব সুন্দর ছবি আঁকা। বাবা বলত এটার বয়েস অন্ততপক্ষে দেড়শো বছর। এর কাঠের চার দেওয়ালের ভেতরে অনেক জিপসী বাচ্চা জন্মেছে, বড় হয়েছে। ঘোড়ায়-টানা এই জিপসী গাড়িটা নিশ্চই হাজার হাজার মাইল ঘুরে বেড়িয়েছিল একটা সময়ে। এখন এটার ঘোরা শেষ কারণ এর কাঠের চাকাগুলো পচতে শুরু করেছে। বাবা তাই গাড়িটার নিচে ইঁট সাজিয়ে এটাকে খাড়া করে রেখেছিল।

ক্যারাভানে মাত্র একটা ঘর - সেটা অবশ্য আধুনিক বাথরুমের তুলনায় তেমন কিছু বড় নয়। ক্যারাভানের যেমন আকার তেমনভাবেই ঘরটাও ছিল বেশ সরুমত। পেছনদিকের দেওয়াল-ঘেঁষে রাখা দুটো বাঙ্কবেড - একটার উপরে আর একটা, নিচেরটা আমার আর উপরেরটা বাবার।

No comments:

Post a Comment